লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার তিস্তাপাড়ের প্রত্যন্ত ডেওডোবা গ্রাম। গ্রামের একটি বাড়ির উঠানে তখন চলছে শিশুদের গান ও বাদ্যযন্ত্র শেখার আয়োজন। কারও হাতে একতারা, কারও হাতে দোতারা। কোথাও ভেসে আসছে ভাওয়াইয়ার সুর, আবার কোথাও শোনা যাচ্ছে লালন, বাউল, মুর্শিদী ও মারফতি গানের আবহ।
বাংলার লোকসংগীতের এমন পরিবেশ দেখতে সোমবার বিকেলে ওই গ্রামে পৌঁছান বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন। তিনি ডেওডোবা গ্রামের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন ‘মায়ের তরী’ পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনকালে রাষ্ট্রদূত শিশুদের লোকগান শেখার কার্যক্রম, বাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষণ এবং সংগঠনটির বিভিন্ন উদ্যোগ ঘুরে দেখেন। শিশুদের পরিবেশনা মনোযোগ দিয়ে শোনেন তিনি। একতারা, দোতারা, সারিন্দা, বেহালা ও বাঁশির সুরও তাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন বলেন, বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে এ ধরনের উদ্যোগের গুরুত্ব অনেক। দীর্ঘ সময় ধরে ‘মায়ের তরী’ যে কাজ করে আসছে, সেটিও প্রশংসনীয়।
তার ভাষ্য, লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য একটি সমাজের অতীতকে ধরে রাখার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ‘মায়ের তরী’র মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার শিশুরা নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য চর্চার সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে লোকগান ও লোকবাদ্যযন্ত্রের ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ জানান, বর্তমানে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় ‘মায়ের তরী’র উদ্যোগে নয়টি ‘গুরুগৃহ’ চালু রয়েছে। এসব কেন্দ্রে পাঁচ শতাধিক শিশু বাংলা লোকসংগীতের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এর পাশাপাশি দুটি লোকবাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রায় ১২৫ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র শেখার সুযোগ পাচ্ছে। প্রতি মাসে ১৫ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে বিশেষ একটি প্রশিক্ষণ ক্লাসও অনুষ্ঠিত হয়।
সংগঠনটির সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় গুরুরা সাধারণত নিজেদের বাড়িতেই শিশুদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। আর্থিক সংকট থাকলেও তাদের অনেকেই স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের প্রচেষ্টায় শিশুরা লালন, বাউল, মুর্শিদী, মারফতি, ভাওয়াইয়া ও পল্লিগানের পাশাপাশি বেহালা, একতারা, দোতারা, বাঁশি, তবলা, খমক ও সারিন্দার মতো লোকবাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে।
ডেওডোবা গ্রামের ‘গুরুগৃহ’-এর প্রশিক্ষক লিপি দেবনাথ বলেন, অর্থের সংকট এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকাই কার্যক্রমটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। তার মতে, একটি আধুনিক স্টুডিও স্থাপন করা সম্ভব হলে প্রবীণ লোকশিল্পী ও শিশু শিল্পীদের পরিবেশনা নিয়মিত রেকর্ড করে ডিজিটাল সংগ্রহশালা তৈরি করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে অনেক অপ্রকাশিত ও লিখিতভাবে সংরক্ষিত নয় এমন লোকগান ও সুর ভবিষ্যতের জন্য ধরে রাখা সম্ভব হবে।
‘মায়ের তরী’র সংগঠক ইউসুফ আলমগীর জানান, শিশুদের লোকসংগীত চর্চার মাধ্যমে তাদের আত্মশুদ্ধি, মূল্যবোধ ও জীবনবোধের বিকাশ ঘটানোই সংগঠনটির অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি বলেন, সীমিত অর্থ, স্বেচ্ছাশ্রম এবং মানুষের ভালোবাসাকে ভিত্তি করেই প্রায় এক দশক ধরে সংগঠনটির কার্যক্রম চলছে। বড় কোনো অবকাঠামো কিংবা পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সুবিধা না থাকলেও বিভিন্ন গ্রামের বাড়ির উঠানে শিশুদের গান শেখানোর কাজ অব্যাহত রয়েছে।
তার মতে, শিশুদের হাতে একতারা, দোতারা বা বাঁশি তুলে দেওয়া কেবল সংগীত শেখানোর বিষয় নয়। এর মাধ্যমে বাংলার হারিয়ে যেতে বসা সুর, শব্দ ও লোকঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। নরওয়ের একজন সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের উদ্যোগ থেকে শুরু হওয়া এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এখন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশু ও লোকশিল্পীরা যুক্ত—যা দুই দেশের সংস্কৃতির মধ্যে একটি ভিন্নধর্মী যোগাযোগ তৈরি করেছে।
‘মায়ের তরী’র সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে রয়েছে নরওয়ের লেখক, লোকগবেষক, আলোকচিত্রী ও কবি মিস উয়েরা সেথের-এর নাম। ১৯৯৮ সালে প্রথম বাংলাদেশে আসেন তিনি। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের দক্ষিণ নামাজের চর এলাকায় বন্যার পর মানুষের জীবনযাপন দেখতে গিয়ে স্থানীয় নারীদের কণ্ঠে মারফতি ও মুর্শিদী গান শোনেন। সেই অভিজ্ঞতা তাকে বাংলাদেশের লোকসংগীতের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট করে।
পরবর্তীতে স্থানীয় শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে কাজ করতে করতে বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও গভীর হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মায়ের তরী’। বাংলার লোকসংগীতের প্রতি তার আগ্রহের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হলো লালনের ৫৩টি গান নরওয়েজিয়ান ভাষায় অনুবাদ করে বই আকারে প্রকাশ করা।
নরওয়ের রাষ্ট্রদূতের এই সফরে তার সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি হেড অব মিশন আলেতজান্ডা ফাল্ক বাইডেন, প্রোগ্রাম অফিসার শাহপার সেলিম, স্ট্রমি ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডাইরেক্টর মিজানুর রহমান এবং প্রোগ্রাম ম্যানেজার চন্দন কুমার সরকার।
তিস্তাপাড়ের ছোট্ট গ্রামে শিশুদের কণ্ঠে লোকগানের সুর আর হাতে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র—এই আয়োজনেই যেন উঠে আসে বাংলার লোকসংস্কৃতির জীবন্ত এক ছবি। সেই সংস্কৃতির টানেই নরওয়ে থেকে আসা অতিথির সঙ্গে প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুদের তৈরি হয় এক আন্তরিক সাংস্কৃতিক সংযোগ।

0 Comments